Tuesday, December 20, 2011

জ্যোৎস্নার ফড়িং

অনেক  খুঁজেও  আমি এই ভালোলাগার শুরু দেখতে পাইনা। আমাদের শুরুর শেকড় যেমন চলে যায় খুব গভীরে যেখানে ডুবে থাকে গর্ভস্মৃতি। ঠিক সেরকমভাবেই হয়ত জীবনের কোন এক অংশের গভীরে ঢেকে আছে এই শুরুর চিহ্ন। চোখ বুজলে অন্ধকারের ভেতর ঘুরে বেড়ায় এক জীবন্ত কিউবিজম, সেই কিউবিজমে ভেসে থাকে অস্পষ্ট এক ট্রেনের আদল। কখনো কখনো আমার মধ্যেই ছুটতে থাকে ট্রেনটা। আমি সমান্তরাল রেললাইন থেকে বৃত্ত হয়ে ট্রেন ছুঁতে চাইলেই সে হেসে উঠে অবুঝ এক ফড়িংয়ের মত। ফড়িংয়ের পিছু নেয়া এক বাচ্চার মতো আমিও ছুট দেই। ঝিঁকঝিঁক-ঝিঁকঝিঁক করতে করতে সরে যায় ট্রেন। হঠাৎ উড়ে গিয়ে বসে এক গ্লাস সর ভাসা দুধে। ট্রেন বসতেই সর ভাসানো জ্যোৎস্নার গ্লাস হয়ে উঠে বাঁকাচোড়া আয়না যেখানে মুখটা ফিরে আসে বারবার। জেঠিমনি যে মুখ দেখে বলেছিল, ‘ওমা কি সুন্দর! একেবারে জ্যোৎস্না-ধোঁয়া রং!' সাইকেল থেকে নামতে নামতে দুষ্টদা শুনিয়েছিল, ‘কালী, দুধ খেলেই অমন জ্যোৎস্নার রং হয়। তুই যে লুকিয়ে রতনকে দুধ দিয়ে ফেলিস, এজন্যইতো এমন হয়েছিস।‘

কালী আমার খারাপ নাম দুষ্টদার দেয়া। আমার ভালো নাম নন্দিনী, রবীন্দ্রনাথের সেই নন্দিনী, আর দুষ্টদার ভালো নাম রবি। আমাদের নাম রাখার সময় থিয়েটার-পাগল ছোটকা নাকি বলেছিল ‘সৃষ্টি এবং স্রষ্টা দুই-ই ঘরে রাখলাম।’ আর সেই জ্যোৎস্না মুখের নাম ছিল কিশোর। ও আমাদের বাড়ির কেউ ছিল না। হয়ত একজন হয়ে উঠতেও পারতো। ছোটকার চেষ্টা ছাড়াই  যেমন সে আমাদের সাথে মিলিয়ে হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি। আমরা জন্মের আগেই জন্মেছিলাম যক্ষপুরীর অন্ধকারে; কথা বলেছিলাম রক্তকরবীর ভ্রুণে। এ বাড়ির কেউ না হতে পারা কিশোর নন্দিনীর জন্য রক্তকরবী আনতে পারেনি। সে সুযোগ তার হয়নি। তবে ও নন্দিনীকে রং দিয়েছিল;  দুটো রং থেকে একটা নতুন রং তৈরির ম্যাজিক শিখিয়েছিল। নীলে হলুদ ছুঁয়ে দিলে সবুজ, লাল-সাদায় গোলাপী আর কালো-লালে জন্ম নেয় খয়েরি। কোন কোন রাতে বাবা যখন মাকে ডেকে নিত নিজের ঘরে, মা ভাবত আমি ঘুমিয়েই আছি। মার ভাবনাকে সত্যি করতেই অন্ধকারের সাথে আমার জেগে থাকা। একলা একটা ভয় সাঁই সাঁই করে ঢুকে যেত ভেতরে। আমি তখন ভয়ের উপর রং ঢালতাম; রঙের সাথে রং ছোঁয়াতাম। সারি সারি রং ট্রেনের মত আমার চোখের মধ্যে ছুটে যেত। ভরা জ্যোৎস্নার ভেতর আমিও ছুটতাম রঙের পিছনে। ছুটতে ছুটতে একসময় রঙের উপর ঘুমিয়ে পড়তাম। একদিন কিশোর একটা কচ্ছপ আর ছোট্ট এক ব্যাঙ এনে দিল আমাকে! দিলু-শিলুর কথা সে কাউকে এমনকি ঠাকুরদাকে পর্যন্ত বলেনি! আমি ঠাকুরদার সামনে কোনকিছু আড়াল করতে পারিনা। কিশোরের মত ঠাকুরদার ঘরে থাকলেতো আমি সব বলে দিতাম! আমার ভেতরটা হয়ে যেত পুকুর আর ঠাকুরদা একটা ছিপের মত টেনে তুলতো সব কথা। কিন্তু কিশোর ছিল গভীর জ্যোৎস্নার এক পুকুর।

‘ঠাকুরদা’ ডাকও আমাদের জন্য ছোটকা এনেছিল নাটক থেকে যেখানে ঠাকুরদা গান করে ‘আমরা সবাই রাজা’। আমার ঠাকুরদা অবশ্য গান জানতো না আর এ বাড়িতে রাজা বলতে একমাত্র তাঁকেই জানতাম। ঠাকুরদার একটা সাধারণ কথাও ছিল আমাদের কাছে আদেশ। রাজার আদেশ বলেই রাত এগারোটায় কিশোরকে চলে যেতে হলো। হঠাত ঘুম ভাঙিয়ে দেয় ঠাকুরদার কথা ‘আমি জীবিত থাকতে যেন এই ছেলে বাড়ির ত্রিসীমানায়ও না আসে!’ বড় জেঠু আস্তে করে বলে ‘এই রাতে! কাল সকালে নাস্তার পর না হয়...’ তারপর কিছু শুনতে পাইনা; শুধু আমাদের নতুন বাবু কেঁদে উঠে। আমাদের ঠাকুরদার চোখ কথা বলে, আঙুল কথা বলে। আমরা সেই কথা দেখে বুঝে নেই থামার সময়...বলার সময়। আগেই জানতাম ঠাকুরদার কাছ থেকে কোনকিছু লুকিয়ে রাখা অসম্ভব! এখন শিলু-দিলুর সাথে আমাকেও নির্ঘাৎ পানিতে ফেলে আসবে!  নিজের কথাই ভেবেছি সেরাতে। ভাবিনি অন্ধকারের কোথায় সরে গেল অতটা জ্যোৎস্না?  জ্যোৎস্নাতো এ বাড়ির কেউ ছিল না কখনো। ও উড়ে এসেছিল আর আমি জন্মেছিলাম। এ বাড়ি ছিল তার আশ্রয় মাত্র কিন্তু আমার একমাত্র ঠিকানা! তাছাড়া বাড়ির রাজাকে সাহস করে যদি জিজ্ঞেসও করতাম ‘কোথায় কিশোর?’, কাকুর থিয়েটার দলের সেই রাজার মত আঙুল দিয়ে ফুলের কলি ফুটাতে ফুটাতে হয়ত বলত ‘বুদ্বুদের মতো সে লুপ্ত হয়ে গেছে।‘ ছোট মামাও বলে ঠাকুরদা নাকি ভ্যানিস করে দিয়েছে। নিজেও ভ্যানিস হওয়ার ভয়ে সত্যি যেন লেবু কাঁটা হয়ে গিয়েছিলাম; সারা সকাল লেবুবাগানেই লুকিয়ে ছিলাম।  দুপুরেও যখন ঠাকুরদার ঘরে ডাক পড়েনি বুঝে নিলাম আমি বিলুপ্ত হবো না বেঁচে থাকবো। এই বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে ছাদ থেকে ফেলে দেই শিলু-দিলুকে। পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রয়োজনে কিছু মায়া ফেলে দিতে হয়। কিছু মায়া ভুলে যেতে হয়। একটা দীর্ঘ স্রোত সেদিন ঢেলে দিলাম মায়ার উপর। তারপর ছাদে পায়চারি করতে করতে রাতের কারণ বের করে দুষ্টদাকে গিয়ে বলি ‘দুধ খাও বলেই তোমরা অমন বোকা আর পচা। তোমারেও বের করে দেবে দেখো!’ অবশ্য ছোটকা বলেছিল ‘সে এক কালবৈশাখী।’ এতেই যেন সব বলা হয়ে গেল। এই ঝড়ে বাড়ির লোক ক্লান্ত; বাইরের ঝড়ে তাই তাদের কোন তাড়া নেই। আমিই দৌড়ুই ছাদের কাপড় আনতে। ছাদের বাতাসে দুলে উঠে একটা ট্রেন; আরেকটু জোর বাতাস হলেই দড়িতে ঝুলে থাকা ট্রেনটা ফড়িং হয়ে যাবে। পেছনে রতন ভাই উঠে আসে।  উঁচু দড়িতে ঝুলানো আধ-ভেজা কাপড়ের সাথেই যেন কথা বলে- ‘আহারে পোলাডা তাড়াহুড়ায় টি-শার্টডা ফালায় গেছে। মেঝ কাকা এক্কেরে ভাইঙ্গা পড়ছে। কি এমন হইল যে বুড়া এত্ত সোহাগ করতো সেই কিনা... আল্লাহ্ই মালুম পোলাডার উপরে বুড়ার নজর ছিল না কুনজর ছিল!’  আরও সব ভাবনা বাতাস উড়িয়ে নেয় আমার  অন্যপাশে। আর আমার কাছে ঝড়  নিয়ে আসে ট্রেন অথবা আমাকেই নিয়ে যায় ট্রেনের কাছে। কালবৈশাখী থেকে যায় আমার মুঠোতে...
 এক সন্ধ্যায় আলমারীর কোণে কালবৈশাখী দেখে বড় ফুফু চমকে গেল- ‘কত শত্তুর! কত শত্তুর!’ সবজি কেটে তুলে নেয়ার পর এক-আধটা টুকরো মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেই ফুফু যেমন বলে ‘শত্রু পুরা বিনাশ হয় নারে! একটা না একটা শত্রু আমার বাপ-ভাইয়ের পেছনে আছেই!’ চিরকুমারী ফুফুর চিন্তা-দুশ্চিন্তার সবটা জুড়েই এই বাড়ির মানুষ। কমলা খালাকে খুব সাবধানে তাই সবজি তুলতে হয়, ধুতে হয় যেন এবাড়ির কোন শত্রুর চিহ্ন থেকে না যায়। আর আমি কিনা একটা শত্রু যত্নে তুলে রেখেছি! ট্রেনটাকে কেন সেই ঝড়ে ফড়িং হতে দিলাম না? আমি কি জানিয়ে দিতে  চাই এ বাড়ি এক ট্রেনের স্টেশন...এক কালবৈশাখীর ঠিকানা! কিন্তু সেতো এ বাড়ির কেউ না! কেউ না! ফুফু রতনকে চুপিচুপি ঘরে ডেকে আনে ‘মেঝ ভাবী দেখলেই একটা ঢেউ উঠবে! এক্ষুণি পুড়ায় ফেলা উচিত! বাইরে জ্যোৎস্না নামছে; ডর পাবি না। আয়াতুল কুরসী পড়তে পড়তে এক দৌড়ে চলে যাবি। বাড়ির পেছনে কাশবনের ধারটায়...’
আমাদের বাড়িতে কোন সন্ধ্যায়  উইপোকা উঠলে, উঠোনের মাঝখানে আগুন ধরানো হয়। সারি সারি পোকারা ছুটে আসে আলোর কাছে। আগুনে পাখা ডুবে যাবার গন্ধটা শুরুর দিকে খারাপ লাগে; তারপর কেমন এক নেশা ধরে যায়। মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে উল্লাস ‘পীপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে... মরিবার তরে।‘ শত্রুর পোড়া ডানার গন্ধেও হয়ত এমন মোহ থাকবে।  কিন্তু  হঠাৎ ট্রেনটাকে তুলে নেই আমার চোখের ভেতর। সে ডানা ঝাপটায়...ঝিঁকঝিঁক ঝিঁকঝিঁক।  আমার বা পাশে, ডান পাশে বেড়ে উঠে কাশফুল; ট্রেন চলে যায় সাদা সাদা কাশফুলের ভেতর।  একটা ঘন কাশবন ডাকে ‘দিদি! দিদি!’ আমি নিজেকে লুকিয়ে নেই কচ্ছপের ভেতর। কাশফুল তুমি এ বাড়ির ত্রিসীমানায় এসো না! তোমাকে কেউ দেখে ফেলবে! ছোটকা বলেছে  কাশফুলেরা এখন দার্জিলিংয়ে থাকে।  কাঞ্জনজঙ্ঘার আলো আর  চা-বাগানের  ঘ্রাণ এখন তোমার আশ্রয়। সেখানে তুমি পাহাড়ের পাঁচালী শোন, ভাল থেকো। ঘোরের মধ্যে জেগে উঠে সেই জীবন্ত কিউবিজম, সেখানে দূরের এক চা বাগান  ডাকে ‘কিন্তু আমার ঠিকানা ? নন্দিনী! নন্দিনী! নন্দিনী!’... 

চোখ খুলতেই ট্রেনটা চোখ থেকে উড়ে বসে রতনের হাতে; জ্যোৎস্নার ফড়িং হয়ে উড়ে যায়। আমি পাখা ধরার চেষ্টা করি; চোখে আটকে রাখতে চাই ঝিঁকঝিঁক ঝিঁকঝিঁক। কিন্তু এই ফড়িং হাওয়া চায়, আলো চায়, ভেঙে ভেঙে রক্তকরবী হতে চায়। কাশফুলে যতই আগুন বাড়ে, আমি ততই সমান্তরাল রেললাইন হয়ে যাই- ‘নন্দিনীর চোখে বেঁচে থাকো ঝিঁকঝিঁক। ভুল আলো তোমার নাগাল পাবে না কোনদিন। তোমার পরিচয় রক্তকরবীর ঘ্রাণে। এই দেখো, নন্দিনীর চোখে কতটা জ্যোৎস্না, কতটা রক্তকরবীর ঘ্রাণ!‘ সে হেসে উঠে দুষ্ট এক ফড়িংয়ের মত; ফড়িংয়ের পিছু নেয়া এক বাচ্চার মত আমিও ছুটে যাই। এবার ছুঁতে পারলেই ঠিকঠাক চোখের জ্যোৎস্নায় তুলে নিব! দূরে ঘন কাশফুলের জ্যোৎস্নায় আগুন তাড়া দেয় ‘মরিবার তরে... মরিবার তরে’...      



No comments:

Post a Comment