Wednesday, September 28, 2016

ঠিক এখানেই- গল্পের দু'শ বিয়াল্লিশ কিংবা পঞ্চাশতম শব্দে থমকে পড়ি আমি। কলে পড়া অসহায় ইঁদুরের মতো আটকে যাই শব্দের ফাঁদে আর বাবা নামক সম্পর্কের বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে আমার কেবলই দেখা হতে থাকে। আমার বাবার অবশ্য অল্পতেই ঠাণ্ডা লাগার ধাঁচ ছিল না কিংবা থাকলেও হয়তো সেটা আর ভাবতে পারি না। একটু একটু করে সাইকোটিক ডিপ্রেশনে ডুবে যাওয়া সেঝ আপা বলে আরিটোলা কলোনীর এই ১১ নাম্বার বাসার পুরনো দেয়ালের চুনকামের গভীরে বাবাকে দেখতে পাওয়া যায়। আপা দেখেছে আশ্চর্য রক্ত রাঙা কাপড় হাতে, দুরন্ত ষাঁড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী যোদ্ধা- আমাদের বাবা; দুধ সাদা সব বৃষ্টিতে ভিজে যায় লাল কাপড়, দুরন্ত ষাঁড়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী যোদ্ধা- আমাদের বাবা। সেঝ আপা দেখতে পায় একাত্তরও - প্রচণ্ড ঠাণ্ডা জলে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে তিনটে গ্রেনেড হাতে পাকিস্তানী ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অপরাজেয় মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের বাবা। মা বলে, নভেম্বরের সেই শীতের রাতে বাবা সাড়ে নয় ঘন্টা পানিতে ছিল। মায়ের সাথে আমাদের সম্পর্কটা খাবার ঘরের বারোয়ারি সবুজ গ্লাসটার মতো। যে কেউ যেমন এ গ্লাসে অনায়াসে পানি ঢেলে নেয়, আমরাও তেমন নির্দ্বিধায় মিশে যাই মায়ের সত্যে, মায়ের বলা বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচির সাথে।
বাবাকে 
কখনোই প্রশ্ন করে জানা হয়নি সাড়ে নয় ঘণ্টার সত্যতা । তবে বাবার অল্পতেই ঠাণ্ডা লাগার ধাঁচ ছিল ভাবতে পারি না। মনে পড়ে, ঝড় এলে বাবা আমাদের নিয়ে দরজার পাশে বসে থাকত।  চাল উড়ে যাওয়া ঘরের থেকে বাইরের ঝড়ই নাকি নিরাপদ। ঝড়ের রাতে বাইরে বেরুনো কোন অবস্থাতেই মনঃপুত ছিল না আমার।  তবু ঝড় এলে শাঁখের করাত হয়ে প্রতিবার দরজার কাছেই বসে থাকতাম। ঝড়-বৃষ্টি-ঠাণ্ডার ভয় ছিল না বাবার কোন কালেই।নিখিলেশ, গোয়ানিজ ডিসুদাদের মতো রোদ-ঝড়-বৃষ্টি যাই থাকুক বাবাকে ঠিক পাওয়া যেত আরিটোলা রোডের উত্তমদা'র চায়ের দোকানে। সন্ধ্যের পর যে চায়ের দোকান হয়ে উঠত অন্য কিছুর আসর। কেন যেন বৃষ্টির রাতগুলোর কথাই বেশি মনে পড়ে- সবুজ বারোয়ারি গ্লাসের মতো আমাদের মা এক ঠায়ে বসে থাকত দরজার পাশে জলচৌকি পেতে। মা আমাদের না বললেও আমরা বাবার শরীরে অন্য রকম ঘ্রাণ পেতাম। সেই ঘ্রাণে ভারি হতো আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসা, বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে ঘরময় ভেসে বেড়াতো বাবার দরাজ গলায় গাওয়া গালিবের গজলের সুর। এই গজলের সুর কিংবা এসব বদভ্যেসের জন্য ছোট মামা হয়তো বাবাকে মির্জা গালিব বলে ডাকতো। বড়ো মামা অবশ্য সম্বোধন করত আমড়া কাঠের ঢেঁকি বলে।

বড়ো মামাই একদিন 
শবে বরাতে  চালের রুটি দিয়ে হালুয়া খেতে খেতে আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসার একজন পিতাকে ভালো-মন্দের সত্যেতে মিশিয়ে দিয়েছিল, 'ওর মদ আর জুয়ার নেশার জন্যই চাকরি গেছে। নির্ঘাৎ জুয়া খেলার জন্যই পাখা চুরি করেছে ও।'  হ্যাঁ, তখন আমিও ভেবেছি আর কোন কারণ ছিল না তো। মতিঝিল তখন ছোট্ট এক জলাশয় থেকে একটু একটু করে পরিণত হচ্ছে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। বাড়ছে ঘুপচি, আভিজাতিক আপিস ঘর; বাড়ছে চাহিদা বৈদ্যুতিক পাখার, একটু বিলাসিতার। আপিস পাড়ার সাথে সাথে বাড়িতেও  শুরু হয়েছে হাওয়ার বিলাসিতা কিংবা প্রয়োজনীয়তার। বাবা তখন বৈদ্যুতিক পাখা তৈরির কারখানার জুনিয়ার সুপারভাইজার। হয়তো সেই সুযোগেই চুরি করেছিল একটা মাত্র পাখা। বাবার চুরিকে কাজে লাগিয়ে হয়তো আরও দুটো পাখা চুরি হয়েছিল কারখানা থেকে বাবার অজান্তেই। সেই তিন পাখা চুরির দায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল আমাদের 
বাবা। ক্লাসে একবার ইসমাঈল স্যার 'ফ্রড ট্রাইঅ্যাংগেল' পড়িয়েছিল, 'প্রয়োজনীয়তা, চাপ আর যুক্তিসহকরণ (সবাই করছে, আমি করবো না কেন) আমাদেরকে চোর বানায়।' এই তিন কারণের ভেতর বাবাকে তো দেখতে পাই না। তাই হালুয়া দিয়ে চালের রুটি খেতে থাকা মামার কথাকেই সত্য বলে মনে করেছি অনেক দিন।  হয়তো তাই বাবাকে আমার ঠাণ্ডার গভীরেই ভাবতে ভালো লাগে যেখানে বৈদ্যুতিক পাখা বলে কিছু থাকে না।  

অবশ্য খাবার ঘরের বারোয়ারি সবুজ গ্লাসের মতো আমাদের মা একদিন বলেছিল, বাবা আসলে চুরি করেছিল বড়ো মামার জন্যই। ফাতেমা আপার বিয়েতে শ্বশুর বাড়ি থেকে অনেক কিছুর সাথে বৈদ্যুতিক পাখাও যে যৌতুক চেয়েছিল। ওরা আমাদের বড়ো আপাকে কালো বলে পছন্দ করেনি কিন্তু বদলে পছন্দ করেছিল ফাতেমা আপাকে। অমন সুপাত্র, বড়ো মামাও না করেনি। যদিও পাখা চোরের কালো মেয়ের বিয়ে হয় নি কোনদিন, তবু আরো এক মেয়ের বিয়ের সানাই ধরে রাখতে   
হয়তো একটা বৈদ্যুতিক পাখা চুরির দরকার পড়েছিল আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসার এক মির্জা গালিবের।  খুব রাগ হয় বড়ো মামার উপর, ফাতেমা আপার শ্বশুর বাড়ির উপর যে বাড়িতে আমরা অপাঙক্তেয়, ভিখিরি টাইপের শ্যালক/ শ্যালিকা যারা বিনা নোটিশে কাকভেজা হয়ে রাত দশটায় আসতেও দ্বিধা করে না, বাসায় এসে খাবারের বাটিতে ইতস্তত চামচ চালায়, মুখ গুজে শুনে কতটা টানাটানিতে চলছে ব্যবসা। মাঝে মাঝে বাবার চুরি করা পাখাটা ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হয়। হয়তো এতদিনে হারিয়ে গেছে সেই পাখার কল-কব্জা অবধি। তবু মনে হয় এখানেতো কোথাও ছিল। হোক না পরাজিত তবু ছিলতো কোথাও আমার বাবা। হয়তো  তাই সেই বাড়িতে এখনও যাই, ওরাও আমাদের মুখের উপর না বলতে পারে না। হয়তো এও এক ধরনের ঋণশোধ কিংবা বারবার ঋণী হয়ে থাকা, ঋণী করে রাখা।

বাবা বৃষ্টিতেই হারিয়ে যেতে চেয়েছিল আজীবন। আচ্ছা, গল্পের লেখক কী বললেন? মৃত্যর দিনে বৃষ্টি মানে বেহেশত পাওয়ার সুলক্ষণ! বাবাও কী তবে সমস্ত কবীরা গুণাহ ছাপিয়ে বেহেশত পাবে ঈশ্বরের করুণায়? কিন্তু বাবাকে যে মৃত বলেই ভাবতে পারে না আমাদের সবুজ বারোয়ারি  গ্লাসের মতো মা।মা বলে বাবা ফিরবে এক বৃষ্টির রাতে, ঠিক যেমন করে বাবা চলে গিয়েছিল। এসে বলবে, 'নন্দিপাড়ার  জমি বিক্রির টাকা ফেরত নিয়ে আসলাম। ওদের সাথে ব্যবসা নয়,  নিজে একটা পাখার দোকান দেব- লিলুয়া পাখা। বাবা যে বন্ধুর সাথে ব্যবসা করবে বলে ঠিক করেছিল, তার কাছে গিয়েছি অনেক বার। এখনও যাই। মিজানুর চাচা বলে সেই বৃষ্টির রাতে বাবা টাকা ফেরত নিয়েই চলে এসেছিল। কিন্তু বাবা তো আর বাড়ি ফেরে নি। মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ জানি, তবু মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, সেই বৃষ্টির রাতে বাবাকে কী নিখোঁজ করেছে ওরাই

বাবাকে আমরা মরে যেতে দিতে চাই না। তাই বারবার মিজানুর চাচার বাড়ি যাই, বৃষ্টি হলে কাকভেজা হয়েই যাই।  'চাচা বাবার কোন  খোঁজ?'- এখন সে প্রশ্নও করতে হয় না। চুপচাপ বসে থাকি, সামনে বসে থাকেন বাবার বন্ধু।  নাহ্‌ বন্ধু নয়, এক শহুরে সওদাগর। মাথার উপরে ঘুরতে থাকে একটা  সিলিং ফ্যান। মনে হয় বাবা আছে, ভীষণ ভাবে আছে।  হাওয়া কী তবে বাবার মতো হয়?



Saturday, April 16, 2016

শৈশবিক কষ্টের ঘ্রাণ

কি বললেন? আমার কষ্ট জানতে চান? চুয়ান্নতম জন্মতিথি যোগ হলো জীবনের খাতায়। কম করে হলেও পৃথিবীতে কাটিয়েছি ১৯,৭১০ দিন- ৪৭৩,০৪০ ঘন্টা। তার মধ্যে কত মিনিট, সেকেণ্ড সুখের ছিল? যদি সুখ-কষ্ট সমানো হয় তবে ২,৩৬,৫২০ ঘন্টার গাঢ় কষ্টের হিসেব। কতরকম কষ্ট; কতো তার ছড়ানো পর্যায়। অতো সময় হবে আপনার আজকে? তাছাড়া ভাবতেও সময় লাগে বৈকি; বয়সতো কম হলোনা বাপু। ঐ দেখো কি বলে। খুব আপন কিছু কষ্ট; যা এতবছর পরেও ঠিক মনে আছে সেরকম কিছু শুনতে চান? আপনি ভীষণ কৌতূহলী পাঠক। এর সংখ্যাও কি কম! কিছু কষ্টের চুলে পাক ধরেছে, দাঁত পড়েছে আমারই মতো, কোন কষ্ট আমার মেয়ের বয়সী। আবার একরত্তি নাতীটার সমান কষ্টও আছে। পুরনো ভীষণ কষ্ট মেলে নাড়াচাড়া করাও তো একধরনের কঠিন কষ্ট পাঠক। ও্‌, বললে হালকা হওয়া যায়! মেঘ দেখতে হালকা, কিন্তু সেলাই ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ভেতরের ভারী জলের দলা। ভারী মেঘে মেঘে ঠোকাঠুকি; আসে দুঃখের বাজ। এতসব সত্ত্বেও বলতে বলছেন? আপনাকে কি বিশ্বাস করা যায় পাঠক? কাউকে বলিনি সেসব কষ্ট কোনোদিন। আমি নিশ্চুপ হতে শিখেছিলাম সেই কবে। স্তব্ধতার কষ্ট আছে জানেন, শব্দেরও যে কষ্ট আছে সেটা জানেন? হয়তো জানেন হয়তোবা না...

আজ প্রচণ্ড গরম পড়েছে তাই না! যাকে বলে বৈশাখী গরম। পাঠক, বর্তমানের আলোটা আরেকটু কমিয়ে দিবেন কষ্ট করে? বড্ড চোখে লাগছে। জানালাটা একটু খুলে দেবেন...একি, কি সুন্দর পূর্ণিমা আজ‌! পৃথিবী কত বদলে গেল, কত দূষিত প্রকৃতি। অথচ দেখুন এত শতাব্দী পরেও চাঁদ কলঙ্ক বুকে নিয়েও সেই একই রকম আছে- তার আলো এখনো কত শুদ্ধ! পূর্ণিমার সাথে হাস্নাহেনার এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। আপনি দেখবেন এই রাতেই ফুলগুলো অন্যরকম হয়ে যায়- আমি বলি 'জ্যোৎস্নার ফুল'। সেইরাতে গন্ধটাও হয় আলাদা- আর সব রাতের মত না- কেমন একটা সুখী সুখী গন্ধ। শব্দ কিভাবে সৃষ্টি হয় পড়েছি বইয়ে, ফুল গন্ধ কি করে সৃষ্টি করে লেখা আছে কোথাও? কষ্ট পেলে আমি জ্যোৎস্নার ফুল হতে চাইতাম, সারা শরীরে ধরে রাখতে চাইতাম সুখী সুখী গন্ধ। একটা জ্যোৎস্নার ফুল না হওয়ার কষ্ট লেগে আছে বুকে...

ঠিক আমার ঘরের জানালার কাছটায়, একটা হাস্নাহেনার ফুলের গাছ ছিল। তার এক ডাল লেগে থাকত জানালার শিক ঘেঁষে। কিশোরী মেয়ের মত কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে বলত 'কি করিস?' কখনো বলতো 'তুই আমার সই হবি? রাতে আসিস, তোকে জ্যোৎস্না ফুলের গন্ধ দেব!" রাতে জানালা বন্ধ করতে ইচ্ছে হতোনা আমার। কিন্তু বুবুর কঠিন আদেশ জানালা খোলা রাখা চলবেনা- "আইন্ধারে আত্না, জ্বীন-ভূতেরা ঘুইরা বেড়ায়।" ভাবতাম "আত্নারা কি খারাপ?" আমার হাস্নাহেনার ডালে থাকা সেই সইয়ের আত্না- সে কি খারাপ? ও আমায় জ্যোৎস্না ফুলের গন্ধ দেবে। আমি খুব চাইতাম জানালাটা খোলা থাকুক। আমার সই কথা বলুক রাতভর। বাতাসের ভেতর জেগে উঠুক জ্যোৎস্না ফুলের গন্ধ। রাতের আঁধারে সইয়ের সাথে জোলাভাতি না খেলার কষ্ট আছে আমার।

আমার জন্ম সন্ধ্যায়; সেদিন পূর্ণিমা ছিলনা। থাকলে হয়তো আমি হতাম জ্যোৎস্নার ফুল; গায়ে সুখী সুখী গন্ধ। সেবার ছিল দুর্যোগ যাপনের বছর। সারাদেশ জুড়ে উলট-পালট বন্যা। আমরা আটকে পড়লাম 'সুরপুর' গ্রামে। ফুলে তখন লেগে থাকে বিষ। মানুষগুলো হয়ে উঠেছে স্বার্থপর, নিষ্ঠুর। সেবছরই আমার বাড়ির পাশে স্ত্রীর হাতে খুন হলো স্বামী। হয়তো পরকীয়া, হয়তো অব্যক্ত কোন কষ্ট থেকে... আপনি সেদিনো যদি পাঠক হতেন, ঘটনাটা আপনার খুব ভাল জানা থাকত। আপনি জানতেন ওদের ভেতরের কষ্ট। হয়ত গর্ভে থেকে কান পেতে শুনেছি সেসব; পোকায় কাটা ফুলের গল্প শুনে শিউরে উঠেছি।

মাঝে মাঝে স্মৃতি মনে করার খেলা খেলি। কোথাও পড়েছিলাম চাইলে মানুষ জন্মক্ষণ মনে করতে পারে; তবে শুদ্ধ মানুষ হতে হয়। অত শুদ্ধ মানুষ তো নই; অতদূর অতীতে আমি যেতে পারিনা। আমার প্রথম স্মৃতি- আমার পরের বোনটির জন্মদিন। তখন আমি দুই বছরের। ঝাপসা মনে পড়ে- সুন্দর একটা সকাল, শোবার ঘরের বন্ধ দরজা, সেই তালা আটকানোর জন্য সোনালী রঙের কড়া। এ দরজা বহুবার বন্ধ হতে দেখেছি। অদ্ভুত সব রহস্য নিয়ে এ দরজা বন্ধ হত। দরজার ওপাশে যেমন পৃথিবীতে শিশুর আসা নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি শিশুর না আসাও নিশ্চিত হয়েছে। 'সুখী পরিবার মানেই ছয় সন্তান' এ মন্ত্রে বিশ্বাসী কিংবা সন্দেহগ্রস্থ বাবা তার অতিরিক্ত পুত্রের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে, গর্ভধারিণী করেছে গর্ভনাশ ঠিক ওখানে; বন্ধ দরজার ওপাশে। অস্ত্র দিয়ে কাটা হয়েছে এক গর্ভজাত ছেলের কোমল হাত-পা; অনেকটা মুরগীর মত করে। সেই মা কতদিন মুরগী খেতে পারেনি, অপরাধবোধ নামক কষ্ট বয়ে বেড়িয়েছে জীবনে। কষ্ট বড় হতে হতে, কত বড় হতে পারে? সেই বন্ধ দরজার কষ্ট আর আমার কষ্ট এক হয়ে যায়। আমি সেই কয়েক ইঞ্চি শিশুটির কথা এখনও ভাবি। সে কি শুদ্ধ মানুষ হয়ে জন্মাত, বড় হতো? নাকি দূষণের হাওয়া তাকেও দূষিত করত...তার আত্নাকে? তাকে না জানার কষ্ট আছে আমার। শরীরের ভগ্নাংশকে চাপা দেয়া হয়েছিল পুরোনো লেবুগাছের নিচটায়। সে গাছের কড়া লেবুফুলের গন্ধ এখনো যেন পাচ্ছি। আচ্ছা, লেবুগাছের কষ্ট আছে কিনা আপনি পড়েছেন কোথাও? বেশি কষ্ট হলে ওর গন্ধ খুব তীব্র হয় অথবা কষ্টের তারতম্যে গন্ধেরো রকমফের হয় কিংবা মাটি থেকে শুদ্ধ শিশুর গন্ধ নিয়ে জন্মাতে পারে লেবুফুল...এরকম কিছু আপনি পড়েছেন?

আচ্ছা, কি যেন বলছিলাম? দেখুন তো সব উলট-পালট করে ফেলছি। কি বললেন? ওহ্‌ খুনের কথা...হ্যাঁ, সেই খুন না হলে আমার জন্মই হতোনা। জবাই করে শরীরটা পুঁতে ফেলা হয় বটগাছের নিচে আর মাথাটাকে ভাসিয়ে দেয়া হয় বন্যার পানিতে। প্রায় ভাবি সেই শরীরবিহীন চোখের দৃষ্টি কেমন ছিল? বন্ধ ছিল নাকি তাকিয়ে ছিল কারো দিকে বিস্ময়কর কষ্ট নিয়ে? বসতির ইতিহাসে সে ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। খুনের বাড়ি স্বচক্ষে দেখতে লোক আসছে...যাচ্ছে। আমিও আসতে চাই চাঞ্চল্যকর এই পৃথিবীতে মানুষের কষ্ট দেখতে। আম্মা কষ্টে মাটিতে উঠি-বসি করছে। আব্বা বন্যার জন্য আটকে পড়েছে দূরের কোন এক জেলায়, রাজশাহীতে বোধহয়। আম্মার কষ্ট দেখে বাচ্চা ভায়েরা কাঁদছে। আশেপাশের মানুষ মৃত্যু নিয়ে আপ্লুত; তারা নতুন জন্ম নিয়ে ভাবছেনা। বাবা-মা চাইলেই পৃথিবীতে সন্তান আসেনা। জীবন দিতে লাগে আরো দুটি হাত। আবার সেইসাথে দরকার হয় ঈশ্বরের হাত। দাইয়ের জন্য ছুটোছুটি হচ্ছে, দাই মিলছেনা। একজন পাওয়া গেলো, তিনি আসতে পারবেন না কারণ তিনি ব্যস্ত নতুন ঘরে টিনের চাল তুলতে। কষ্টের সেকেন্ড পার হয়...পার হয় দুদিন। পৃথিবীতে আসা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রতি সেকেণ্ডে।

অতঃপর অমাবস্যার ফুলকে পৃথিবীতে আনতে, চলে এলো ঈশ্বরের হাত আর প্রিয় এক জ্যোৎস্নার ফুল- আমার দাইমার হাত। তিনি নিঃসন্তান মেয়েকে নিয়ে ফকির বাড়ি যাচ্ছিলেন। মেয়ের শখ হলো খুনের বাড়ি দেখবে। ফেরার পথে এক অদ্ভুত রহস্যময় জীবনের টানে তিনি এসে দাঁড়ান আমার ঘরের সামনে, জিজ্ঞেস করেন "কি হইছে এইখানে? এত তামিশ কেন্‌?" এক নারী- সন্তান নেই বলে কষ্ট পাচ্ছে, ফকিরের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে; আরেক নারী সন্তান ধারণ করেও পৃথিবীতে আনতে পারছে না। একজনের মৃত্যু আরেকজনের জন্ম নিশ্চিত করে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত পৃথিবীর তামিশ... জন্ম হল 'আমি' নামক অস্তিত্বের এই দুঃখময় পৃথিবীতে কষ্টের অভিজ্ঞতা নিতে। পৃথিবীতে এসে আমি কিন্তু কাঁদিনি। 'এত কষ্ট কইরা মরা বাচ্চা!' চিনচিনে কষ্ট আম্মার মুখে ঘামের সাথে লেপ্টে পড়ছে। পানি ঢালা হচ্ছে আমার উপর। সবাই প্রার্থনা করছে 'কাঁদো, কাঁদো, মেয়ে তুমি কাঁদো!" মিনিট দশেক পরে শোনা যায় কান্নার শব্দ। নিশ্চিত আশ্বাস দিই 'এই দেখ আমি কাঁদছি! আমি বেঁচে আছি মা, আমি বেঁচে আছি।" পৃথিবীতে এসে আমরা প্রথমেই কাঁদতে শিখি। না কাঁদা মৃত্যুর সমান। কাঁদা মানেই বেঁচে থাকা। নতুন কান্না শুনব বলে অপেক্ষায় থাকা আমাদের। অথচ দেখুন জীবনের পরের মুহূর্তেগুলোতে কান্না কেমন অস্বাভাবিক। কান্নার ভার কত ভারী!

নীরব থাকার অভ্যাস আমার জন্মগত। নীরবে দাঁড়িয়ে দেখেছি আম্মাকে পেটাতে। বিছানায় ফেলে ছোট একটা কাঠের চেয়ার দিয়ে অনবরত পেটাতে। ঘরময় দমবন্ধ মদের এক কড়া গন্ধ ঘুরে বেড়াত, লাফাতো, হুমড়ি খেতো। সেই গন্ধ আমার মাথাটাকে পাথর করে দিত। ছোট চেয়ারটা পিঠে পড়ত, পিঠ থেকে লাফ দিয়ে উঠে আসত কষ্টের এক গন্ধ। ঠিক যেন কাঁঠাল কাঁঠাল গন্ধ। কষ্টের গন্ধ আমার মাথার পাথরটাকে ভাঙত। একটা পাথর লক্ষ পাথর হত। সেই কষ্টের গন্ধটা আমার কত চেনা। সেতো ঐ চেয়ারের গন্ধ। ঐ চেয়ারটা আমার ছিল; ভীষণ প্রিয় ছিল। আব্বা হেকমত চাচাকে দিয়ে চেয়ারটা বানিয়ে দিয়েছিল। এই চেয়ারেই আয়েস করে বসে সকালে মুড়ি ছড়িয়েছি উঠানে 'আয়রে আয়, বাক্‌বাকুম, বাক্‌বাকুম...' চেয়ারটাও ডাকত 'বাক্‌বাকুম'... আমি বুঝতাম। একসাথে পাখির ডানা ঝাপটানোর রোমাঞ্চকর শব্দ শোনার সাক্ষী ছিল সেও। আয়নার সামনে বসে তার সাথে কত কথা বলেছি সন্ধ্যা-দুপুর। ওর প্রিয় ছিল লালফিতে; সেটা দিয়ে বেণী বাঁধলেই হেসে উঠত। ও দেখেছে সবার সাথে তুলনা করতে করতে, কিভাবে নিজেকে আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করেছি। ভীষণ আক্রোশে হাতের নখ দিয়ে আঁচড় কেটেছি কালো মুখে। সেই আঁচড়ের শব্দ সেও শুনেছে। এক সাদা গন্ধরাজ হতে না পারার যন্ত্রণায় আমি কেঁদেছি। সেই যন্ত্রণা সেও জেনেছে এবং কেঁদেছে। একটা মুখ কিভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে তার স্পর্শে- সে বুঝেছে এবং কষ্ট পেয়েছে। আপনি বিশ্বাস করছেন না? কেন নয়? গাছেরও তো জীবন আছে! আপনারাই তো বলেন। আমার চেয়ার শুধুই গাছের মৃত কঙ্কাল ছিল তাই বা ভাবছেন কেন? কোথাও না কোথাও কঙ্কালের গায়ে আটকে ছিল এক টুকরো জীবন। আটকে ছিল এক টুকরো কষ্ট। সেই কষ্টে ছিল কাঁঠাল কাঁঠাল গন্ধ।

আমি নীরব হবার কষ্ট নিয়ে ঘুরতাম। আমি খুব চাইতাম পিঠের উপর ঝাপটে পড়ে কষ্টের গন্ধ নিই নিজের গায়েও। কিন্তু পারতাম না। ভীতু হবার কষ্ট নিয়ে ঘুরতাম। নীরবে কাঁদতাম। কারো সামনে কাঁদতে আমার লজ্জা হতো। আমি চাইতাম না কেউ আমার কান্না দেখুক, কেউ আমার চোখের পানি মুছে দিক। আমি গোসল-ঘরে কল ছেড়ে দিয়ে কাঁদতাম। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে কাত হয়ে পড়তাম। কলের জল, চোখের জল এক হয়ে চলে যেত অচিন ছিদ্রে। আমার জোরে কাঁদতে না পারার কষ্ট ছিল।কলের জলের দিকে তাকিয়ে কখনো চাইতাম মদের ভারী গন্ধটা মরে যাক। দূর ছিদ্রের ভেতর দিয়ে চলে যাক দূরে কোথাও- খুব চাইতাম! কখনো চাইতাম আম্মাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই।

কোনদিন অসহ্য হয়ে আম্মা গোলাপী রঙের ঝুড়িতে কাপড় গোছাতে গোছাতে বলত 'আজকে আমরা চইল্লা যাব।' আহা, 'চলে যাওয়া' শব্দ দুটি কি তীব্র আনন্দের। আমি চলে যেতে চাই বন্ধন ছেড়ে, ছোট্ট একটা পাখির মত। পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে থাকতে আমার দম বন্ধ লাগত। আমার শরীরে মেঘ যেন ভর করত। আমি নৌকা ডাকতে ছুটে যেতাম। কিন্তু কখনই আমাদের যাওয়া হতো না। আব্বা আমাদের যেতে দিতনা। ঘাট থেকে ফিরে যেত কাজীচাচা নৌকা নিয়ে। একটা কষ্টের গুহায় আটকা পড়তাম অসহায় হরিণ ছানার মত। আমরা ভয় পেতাম, আম্মা হয়ত একদিন আমাদের ফেলেই চলে যাবে একা। ছোট ভাই সাদা সুতা দিয়ে হাতের আঙুলের সাথে, আম্মার আঁচল বেঁধে রাখতো। আম্মা উঠলেই যেন টের পাওয়া যায়। একদিন ভোর বেলায় ভাইজান আম্মাকে রেখে আসে নানা বাড়ীতে। আমরা তখন ঘুমে। ঘুম ভেঙে দেখি আম্মা নেই। সাদা রঙের নরম সুতো পড়ে আছে বিছানায় অপরাধীর মত। ঘুম ভেঙে মাকে না দেখার তীব্র কষ্ট নিয়ে বেঁচেছি অনেকদিন। সংসার নামক বস্তুটি কারো অভাবে থেমে থাকেনা। কেউ এসে শূণ্যতা পূরণ করে। একজন নতুন কেউ ঘুমোয় আব্বার ডান পাশের নীল ফুলওয়ালা বালিশটায়, যেখানে আম্মার চুলের মিষ্টি সেই গন্ধ লেগে আছে। অন্ধকার ঘরে ক্ষয় হতে থাকা জোৎস্নাফুলের জন্য বালিশের কষ্ট আপনি কি বুঝতে পারছেন পাঠক?

আম্মা খুব সুন্দর কাঁথা বানাত। খানিকটা ছিড়ে যাওয়া শাড়ি দিয়ে বানানো হতো কোমল কাঁথা বর্ষার দুপুরে। অবশ্য আম্মা খুব যত্ন করে কাপড় পড়তেন; সহজে ছিড়তনা। আম্মা বছরে একটা কাপড় নিত; সেটা রোজার ঈদে। কখনো কখনো তাও নিতনা। রোজার ঈদে আমরা সব ভাইবোন কিছু না কিছু পেতাম। এক ঈদে জুতা নিলে,পরেরবার জামা। দুটো কখনো এক সাথে পাইনি। এতে আমার অবশ্য খারাপ লাগতনা। আমার প্রিয় ঈদ ছিল, যেবার সবাই এমনকি আব্বা-আম্মাও কিছু কিনেছিল। বড়ভাইজান আব্বার জন্য এনেছিল পাঞ্জাবী আর গামছা। আম্মা কিনেছিল বেগুনী রঙের একটা শাড়ি; ছোট ছোট সাদা ফুল বেগুনী জমিনে। কি সুন্দর মানিয়েছিল আম্মাকে। একটু পরপর দৌড়ে এসে পাকের ঘরে আম্মাকে দেখে যেতাম। গলা জড়িয়ে ধরতাম। আম্মা পান মুখে হেসে বলত 'পাগলী আমার, কি করে দেখ। ছাড়্‌ ছাড়্‌, আগুনে পড়বিতো।' আমি আগুনে পড়িনি। তবে প্রিয় বেগুনী শাড়িটা আগুনে পুড়েছিল। আব্বা আম্মার সিন্দুকে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। শাড়ির নিচটা অনেকখানি পুড়ে যায়। সেই পোড়া শাড়ি দিয়ে আম্মা সুন্দর এক কাঁথা বানিয়েছিল আমার জন্য। কাঁথাটা ছুলেই আম্মার গায়ের গন্ধ পেতাম। এই কাঁথা গায়ে জড়িয়েই আমি লিখেছিলাম আমার জীবনের প্রথম কবিতা 'আমার চেয়ে ভাল কে জেনেছে তোরে?/ তুই যে আমার নক্ষত্র, আমি আছি তোর বুকেরই 'পরে/ আমার আচঁল উড়েই গেছে রূপকথারই দেশে/ কে বলেছে তোরে?/ হাত ছুঁয়ে দেখ, আমার আঁচল তোর শরীরে ভাসে/ এই যে আমি এখানটাতে বুকের মধ্য জুড়ে...' আম্মার আঁচল জড়ানো কাঁথা বুকে নিয়ে ঘুমাতাম। কষ্টের পোড়া গন্ধ ভেসে বেড়াত সাদা মশারীর ভেতর।

এই দেখো, কষ্টগুলো কখন যে আমার থেকে আমাদের হয়ে গেল। আমরা তো নির্ভরশীল। আমাদের চারপাশ নিজস্ব সুখ-কষ্টগুলোকে প্রভাবিত করে। আমি হয়তো পিছে-আগে করে ঘটনা বলছি। আমি আসলে কখনোই দিন-তারিখ মনে রাখতে পারিনা। আজ কত তারিখ জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবনা। সময়েরর হিসেব করা অনেক আগেই ছেড়েছি। পৃথিবী কিংবা জীবন নিয়ে আমার মোহ নেই। পৃথিবীতে এসেছি, দেখেছি। এখন টুপ করে চলে গেলেই বাঁচি। ঠিক যেন একটা মেঘের মত। মেঘের জন্মের খোঁজ কজনে রাখে? বৃষ্টি হলে মেঘ মরে যায়। এতে দুঃখ পায় কে বলুন?

তবে আমি 'বার' মনে রাখতে পারি। আমার জন্ম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। আম্মা যেদিন চলে গেল, সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার। সাথী একদিন কেরোসিন খেয়ে ফেলেছিল- দিনটা ছিল শুক্রবার। মুন্সী পানিতে পড়ে মারা গিয়েছিল বুধবারে... আমার প্রথম মৃত্যু দেখার কষ্ট। এক সোমবারে কি সুন্দর একটা গন্ধ ভাসছিল ঘরে, হয়ত ঝোল ঝোল করে রান্না করা কৈ মাছের কোন তরকারী। আমি আপনমনে খেলছি ক্যারামের লাল গুটিটা দিয়ে। গুটিটা আমার খুব প্রিয় ছিল; প্রিয় এক স্বপ্নের মত। হঠাৎ পাশের বাড়ির মকবুল ভাই এসে ছোঁ দিয়ে তুলে নিল প্রিয় লাল গুটিটা। বুকের ভেতর খচ করে উঠল। আমার ছোট হাত সে স্বপ্নের নাগাল পাচ্ছিলনা। মকবুল ভাই বলল ' আমার লগে আয়। এইডা করলে তোরে দিয়া দিমু।' আমি লালগুটিটাকে খুব ভালবাসতাম। একটা লালরঙের স্বপ্নের কাছে পরাজিত হলাম। ভাই সেদিন গোপন খেলার মন্ত্র শিখিয়েছিল...এঁটেল মাটি নিয়ে খেলা। তখন আমার বয়স কত? আট কিংবা নয়। ঠিক করে সব মনেও আসছেনা। না বলতে বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, পানসে অনুভূতি নিয়ে বলছি হয়ত আপনাকে। কিন্তু সেটা ঘটেছিল। আপনাকে বিস্তারিত বলার দরকার নেই। কারণ এরকম ঘটনা আপনি অনেক পড়েছেন অনেক জীবনে।

ঠিক কতদিন পর জানিনা। এক বৃহস্পতিরবার রাতে সবাই ঘুমে, আমার জেগে থাকার রাত। আম্মা কুলায় করে চাল ঝাড়ছিল। আতপ চালের মিষ্টি গন্ধ আম্মাকে ঘিরে রেখেছিল। আমি বললাম এঁটেল মাটি নিয়ে খেলার কথা 'হে আমার গতরো হাত দেয়। আমার ভাল লাগেনা।' আম্মার মুখে কী অদ্ভুত কষ্টের ছায়া পড়েছিল। মেয়েকে নিরাপদে না রাখতে কষ্ট কতটা প্রকট হতে পারে বুঝেন আপনি পাঠক? ছেলেটিকে আম্মা কি করেছিল আমি জানিনা। আমি আর কোনোদিন সেই লালরঙের গুটিটা দেখেনি। শুধু জানি আম্মা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করত। এক সময় মনে হত আম্মা আমাকে বিশ্বাস করেনা। কারো সাথে কথা বললে সন্দেহের চোখে দেখত। আমার কখনো কোন বান্ধবীর বাড়িতে থাকা হয়নি। আমি নিজেকে আটকে ফেলি এক দমবন্ধ অবিশ্বাসের চার দেয়ালের ভেতর। অবিশ্বাসের বোঝা বয়ে বেড়ানোর কষ্ট আপনি কি বুঝতে পারছেন পাঠক? আমার ভায়েরা হতো চম্পা, পুরুষ নয়। পুরুষকে মানুষ ভাবতে না পারার কষ্ট কি যে তীব্র। আমার স্বপ্নে কোন পুরুষ থাকতো না। যদিও বা থাকতো, আমি দেখতাম তারা আমাকে উপুড় করে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মাটির উপর দিয়ে। আমি কাঁদছি- 'আমারে ছাইড়া দাও...ছাইড়া দাও।' মানুষকে বিশ্বাস করতে না পারার অক্ষমতা নিয়ে আমি বড় হয়েছি...

আব্বা ঘটনাটা জেনেছিল আম্মার কাছ থেকে। আমাকে কি যে সব তেতো ঔষধ গেলানো হয়েছিল...আব্বা বোধহয় মনে করেছিলেন আমার গর্ভে বাচ্চা এসে পড়বে। কি বললেন? সেটা তার বোকামী। আট বছরের মেয়ে আবার মা হয়? হবে হয়তো। তবে আট বছরের মা গর্ভবতী হতে পারে। হ্যাঁ, আমিতো হয়েছি। আমার গর্ভে জন্ম নিল যে ভ্রুণ, তার নাম 'পাপ'। আচ্ছা আপনি কি কোথাও পরেছেন পাপ ছেলে না মেয়ে? কি বললেন? পাপের অস্তিত্ব কেবল আমাদের বোধে। কিন্তু আমি তো দেখেছি তার শরীর। কোমল ভ্রুণ, তের বছরের কিশোরী, পয়তাল্লিশ বছরের নুয়ে পড়া শরীর- অনেকটা দেখতে আমার মত। আমার বোধে নয়- আমার ভেতরে বাস। আমি পুণ্যও দেখেছি- আমার ভেতর। পবিত্রতার রঙ আপনারা বলেন শুভ্র। আমি দেখেছি তার রঙ সবুজ; গন্ধটা পায়েস পাতার মত। একটু স্পর্শে সারা জীবন ভরে উঠে। তাকে আমি স্নেহ করে দুমুঠো ভাত বেশি দিয়েছি, পাতে মুড়ো দিয়েছি। কিন্তু আমার পাপ মেয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে দূরে। আমি তার মুখে ছাই দিয়েছি, ঘৃণা করেছি। ঝড়ো বৃষ্টিতে তাকে আমি সারারাত দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। অনুতাপের আগুনে তার মুখে ছ্যাঁকা দিয়েছি। এতে আমার গ্লানি ছিলনা। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি আমার পাপ মেয়ে যেন মরে যায়। আমার পাপকে, আমার সেই মেয়েকে বুকে তুলে না নেবার কষ্ট আছে বুকে। কেমন এক অচেনা গন্ধ তার, কোনকিছুর সাথে মেলেনা...

পাঠক, আপনি কি কাঁদছেন একজন শিশুর শৈশব না থাকার কথা শুনে? এতো সবে শুরু। বাকি রয়ে গেল আমার কিশোরী না হতে পারার কষ্ট। আপনি শুনবেন না মেয়েটাকে কিভাবে ঠকানো হলো, তাকে কিভাবে বিপর্যস্ত করা হলো? কিভাবে বয়সী হবার অপরাধে মেয়েটি কষ্ট পেয়েছিল? আপনি শুনবেন না তার সংসার জীবনের কষ্ট, তার বৃদ্ধ হবার কৃষ্ট! আসলে এক দিনে কত বৃষ্টি চাইতে পারে মানুষ? বর্ষা মাত্র দুমাসের। বারোমাসী বর্ষা কতজন চায়, মিনিটে কতগুলো বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, কতগুলো বৃষ্টির ফোঁটা নিতে পারে মানুষ একসাথে? আজ আপনি অনেক ভিজেছেন।আজ আর নয়। তবে আমি আপনাকে বলব পাঠক। আপনাকে আমি বিশ্বাস করি। আপনি দূর্বলতা জেনে দূর্বল করতে আসেননি। আপনি এসেছেন কষ্টের খোলস ভাঙতে। খোলস ভাঙার বিস্ময়কর শব্দ আমাকে মুগ্ধ করছে। আপনি পাশে থাকুন। একদিন আমিও আপনার পাঠক হবো। আপনার কষ্টের, সুখের বিস্ময়কর খোলস ভাঙব। আজ বৃহস্পতির রাত। এই চাঁদ-রাত জেগে থাকার রাত। আসুন পাঠক, ভরা পূর্ণিমায় আমরা জ্যোৎস্নার ফুল দেখি। গায়ে মাখি সুখী সুখী গন্ধ..

Tuesday, December 20, 2011

জ্যোৎস্নার ফড়িং

অনেক  খুঁজেও  আমি এই ভালোলাগার শুরু দেখতে পাইনা। আমাদের শুরুর শেকড় যেমন চলে যায় খুব গভীরে যেখানে ডুবে থাকে গর্ভস্মৃতি। ঠিক সেরকমভাবেই হয়ত জীবনের কোন এক অংশের গভীরে ঢেকে আছে এই শুরুর চিহ্ন। চোখ বুজলে অন্ধকারের ভেতর ঘুরে বেড়ায় এক জীবন্ত কিউবিজম, সেই কিউবিজমে ভেসে থাকে অস্পষ্ট এক ট্রেনের আদল। কখনো কখনো আমার মধ্যেই ছুটতে থাকে ট্রেনটা। আমি সমান্তরাল রেললাইন থেকে বৃত্ত হয়ে ট্রেন ছুঁতে চাইলেই সে হেসে উঠে অবুঝ এক ফড়িংয়ের মত। ফড়িংয়ের পিছু নেয়া এক বাচ্চার মতো আমিও ছুট দেই। ঝিঁকঝিঁক-ঝিঁকঝিঁক করতে করতে সরে যায় ট্রেন। হঠাৎ উড়ে গিয়ে বসে এক গ্লাস সর ভাসা দুধে। ট্রেন বসতেই সর ভাসানো জ্যোৎস্নার গ্লাস হয়ে উঠে বাঁকাচোড়া আয়না যেখানে মুখটা ফিরে আসে বারবার। জেঠিমনি যে মুখ দেখে বলেছিল, ‘ওমা কি সুন্দর! একেবারে জ্যোৎস্না-ধোঁয়া রং!' সাইকেল থেকে নামতে নামতে দুষ্টদা শুনিয়েছিল, ‘কালী, দুধ খেলেই অমন জ্যোৎস্নার রং হয়। তুই যে লুকিয়ে রতনকে দুধ দিয়ে ফেলিস, এজন্যইতো এমন হয়েছিস।‘

কালী আমার খারাপ নাম দুষ্টদার দেয়া। আমার ভালো নাম নন্দিনী, রবীন্দ্রনাথের সেই নন্দিনী, আর দুষ্টদার ভালো নাম রবি। আমাদের নাম রাখার সময় থিয়েটার-পাগল ছোটকা নাকি বলেছিল ‘সৃষ্টি এবং স্রষ্টা দুই-ই ঘরে রাখলাম।’ আর সেই জ্যোৎস্না মুখের নাম ছিল কিশোর। ও আমাদের বাড়ির কেউ ছিল না। হয়ত একজন হয়ে উঠতেও পারতো। ছোটকার চেষ্টা ছাড়াই  যেমন সে আমাদের সাথে মিলিয়ে হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি। আমরা জন্মের আগেই জন্মেছিলাম যক্ষপুরীর অন্ধকারে; কথা বলেছিলাম রক্তকরবীর ভ্রুণে। এ বাড়ির কেউ না হতে পারা কিশোর নন্দিনীর জন্য রক্তকরবী আনতে পারেনি। সে সুযোগ তার হয়নি। তবে ও নন্দিনীকে রং দিয়েছিল;  দুটো রং থেকে একটা নতুন রং তৈরির ম্যাজিক শিখিয়েছিল। নীলে হলুদ ছুঁয়ে দিলে সবুজ, লাল-সাদায় গোলাপী আর কালো-লালে জন্ম নেয় খয়েরি। কোন কোন রাতে বাবা যখন মাকে ডেকে নিত নিজের ঘরে, মা ভাবত আমি ঘুমিয়েই আছি। মার ভাবনাকে সত্যি করতেই অন্ধকারের সাথে আমার জেগে থাকা। একলা একটা ভয় সাঁই সাঁই করে ঢুকে যেত ভেতরে। আমি তখন ভয়ের উপর রং ঢালতাম; রঙের সাথে রং ছোঁয়াতাম। সারি সারি রং ট্রেনের মত আমার চোখের মধ্যে ছুটে যেত। ভরা জ্যোৎস্নার ভেতর আমিও ছুটতাম রঙের পিছনে। ছুটতে ছুটতে একসময় রঙের উপর ঘুমিয়ে পড়তাম। একদিন কিশোর একটা কচ্ছপ আর ছোট্ট এক ব্যাঙ এনে দিল আমাকে! দিলু-শিলুর কথা সে কাউকে এমনকি ঠাকুরদাকে পর্যন্ত বলেনি! আমি ঠাকুরদার সামনে কোনকিছু আড়াল করতে পারিনা। কিশোরের মত ঠাকুরদার ঘরে থাকলেতো আমি সব বলে দিতাম! আমার ভেতরটা হয়ে যেত পুকুর আর ঠাকুরদা একটা ছিপের মত টেনে তুলতো সব কথা। কিন্তু কিশোর ছিল গভীর জ্যোৎস্নার এক পুকুর।

‘ঠাকুরদা’ ডাকও আমাদের জন্য ছোটকা এনেছিল নাটক থেকে যেখানে ঠাকুরদা গান করে ‘আমরা সবাই রাজা’। আমার ঠাকুরদা অবশ্য গান জানতো না আর এ বাড়িতে রাজা বলতে একমাত্র তাঁকেই জানতাম। ঠাকুরদার একটা সাধারণ কথাও ছিল আমাদের কাছে আদেশ। রাজার আদেশ বলেই রাত এগারোটায় কিশোরকে চলে যেতে হলো। হঠাত ঘুম ভাঙিয়ে দেয় ঠাকুরদার কথা ‘আমি জীবিত থাকতে যেন এই ছেলে বাড়ির ত্রিসীমানায়ও না আসে!’ বড় জেঠু আস্তে করে বলে ‘এই রাতে! কাল সকালে নাস্তার পর না হয়...’ তারপর কিছু শুনতে পাইনা; শুধু আমাদের নতুন বাবু কেঁদে উঠে। আমাদের ঠাকুরদার চোখ কথা বলে, আঙুল কথা বলে। আমরা সেই কথা দেখে বুঝে নেই থামার সময়...বলার সময়। আগেই জানতাম ঠাকুরদার কাছ থেকে কোনকিছু লুকিয়ে রাখা অসম্ভব! এখন শিলু-দিলুর সাথে আমাকেও নির্ঘাৎ পানিতে ফেলে আসবে!  নিজের কথাই ভেবেছি সেরাতে। ভাবিনি অন্ধকারের কোথায় সরে গেল অতটা জ্যোৎস্না?  জ্যোৎস্নাতো এ বাড়ির কেউ ছিল না কখনো। ও উড়ে এসেছিল আর আমি জন্মেছিলাম। এ বাড়ি ছিল তার আশ্রয় মাত্র কিন্তু আমার একমাত্র ঠিকানা! তাছাড়া বাড়ির রাজাকে সাহস করে যদি জিজ্ঞেসও করতাম ‘কোথায় কিশোর?’, কাকুর থিয়েটার দলের সেই রাজার মত আঙুল দিয়ে ফুলের কলি ফুটাতে ফুটাতে হয়ত বলত ‘বুদ্বুদের মতো সে লুপ্ত হয়ে গেছে।‘ ছোট মামাও বলে ঠাকুরদা নাকি ভ্যানিস করে দিয়েছে। নিজেও ভ্যানিস হওয়ার ভয়ে সত্যি যেন লেবু কাঁটা হয়ে গিয়েছিলাম; সারা সকাল লেবুবাগানেই লুকিয়ে ছিলাম।  দুপুরেও যখন ঠাকুরদার ঘরে ডাক পড়েনি বুঝে নিলাম আমি বিলুপ্ত হবো না বেঁচে থাকবো। এই বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে ছাদ থেকে ফেলে দেই শিলু-দিলুকে। পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রয়োজনে কিছু মায়া ফেলে দিতে হয়। কিছু মায়া ভুলে যেতে হয়। একটা দীর্ঘ স্রোত সেদিন ঢেলে দিলাম মায়ার উপর। তারপর ছাদে পায়চারি করতে করতে রাতের কারণ বের করে দুষ্টদাকে গিয়ে বলি ‘দুধ খাও বলেই তোমরা অমন বোকা আর পচা। তোমারেও বের করে দেবে দেখো!’ অবশ্য ছোটকা বলেছিল ‘সে এক কালবৈশাখী।’ এতেই যেন সব বলা হয়ে গেল। এই ঝড়ে বাড়ির লোক ক্লান্ত; বাইরের ঝড়ে তাই তাদের কোন তাড়া নেই। আমিই দৌড়ুই ছাদের কাপড় আনতে। ছাদের বাতাসে দুলে উঠে একটা ট্রেন; আরেকটু জোর বাতাস হলেই দড়িতে ঝুলে থাকা ট্রেনটা ফড়িং হয়ে যাবে। পেছনে রতন ভাই উঠে আসে।  উঁচু দড়িতে ঝুলানো আধ-ভেজা কাপড়ের সাথেই যেন কথা বলে- ‘আহারে পোলাডা তাড়াহুড়ায় টি-শার্টডা ফালায় গেছে। মেঝ কাকা এক্কেরে ভাইঙ্গা পড়ছে। কি এমন হইল যে বুড়া এত্ত সোহাগ করতো সেই কিনা... আল্লাহ্ই মালুম পোলাডার উপরে বুড়ার নজর ছিল না কুনজর ছিল!’  আরও সব ভাবনা বাতাস উড়িয়ে নেয় আমার  অন্যপাশে। আর আমার কাছে ঝড়  নিয়ে আসে ট্রেন অথবা আমাকেই নিয়ে যায় ট্রেনের কাছে। কালবৈশাখী থেকে যায় আমার মুঠোতে...
 এক সন্ধ্যায় আলমারীর কোণে কালবৈশাখী দেখে বড় ফুফু চমকে গেল- ‘কত শত্তুর! কত শত্তুর!’ সবজি কেটে তুলে নেয়ার পর এক-আধটা টুকরো মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেই ফুফু যেমন বলে ‘শত্রু পুরা বিনাশ হয় নারে! একটা না একটা শত্রু আমার বাপ-ভাইয়ের পেছনে আছেই!’ চিরকুমারী ফুফুর চিন্তা-দুশ্চিন্তার সবটা জুড়েই এই বাড়ির মানুষ। কমলা খালাকে খুব সাবধানে তাই সবজি তুলতে হয়, ধুতে হয় যেন এবাড়ির কোন শত্রুর চিহ্ন থেকে না যায়। আর আমি কিনা একটা শত্রু যত্নে তুলে রেখেছি! ট্রেনটাকে কেন সেই ঝড়ে ফড়িং হতে দিলাম না? আমি কি জানিয়ে দিতে  চাই এ বাড়ি এক ট্রেনের স্টেশন...এক কালবৈশাখীর ঠিকানা! কিন্তু সেতো এ বাড়ির কেউ না! কেউ না! ফুফু রতনকে চুপিচুপি ঘরে ডেকে আনে ‘মেঝ ভাবী দেখলেই একটা ঢেউ উঠবে! এক্ষুণি পুড়ায় ফেলা উচিত! বাইরে জ্যোৎস্না নামছে; ডর পাবি না। আয়াতুল কুরসী পড়তে পড়তে এক দৌড়ে চলে যাবি। বাড়ির পেছনে কাশবনের ধারটায়...’
আমাদের বাড়িতে কোন সন্ধ্যায়  উইপোকা উঠলে, উঠোনের মাঝখানে আগুন ধরানো হয়। সারি সারি পোকারা ছুটে আসে আলোর কাছে। আগুনে পাখা ডুবে যাবার গন্ধটা শুরুর দিকে খারাপ লাগে; তারপর কেমন এক নেশা ধরে যায়। মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে উল্লাস ‘পীপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে... মরিবার তরে।‘ শত্রুর পোড়া ডানার গন্ধেও হয়ত এমন মোহ থাকবে।  কিন্তু  হঠাৎ ট্রেনটাকে তুলে নেই আমার চোখের ভেতর। সে ডানা ঝাপটায়...ঝিঁকঝিঁক ঝিঁকঝিঁক।  আমার বা পাশে, ডান পাশে বেড়ে উঠে কাশফুল; ট্রেন চলে যায় সাদা সাদা কাশফুলের ভেতর।  একটা ঘন কাশবন ডাকে ‘দিদি! দিদি!’ আমি নিজেকে লুকিয়ে নেই কচ্ছপের ভেতর। কাশফুল তুমি এ বাড়ির ত্রিসীমানায় এসো না! তোমাকে কেউ দেখে ফেলবে! ছোটকা বলেছে  কাশফুলেরা এখন দার্জিলিংয়ে থাকে।  কাঞ্জনজঙ্ঘার আলো আর  চা-বাগানের  ঘ্রাণ এখন তোমার আশ্রয়। সেখানে তুমি পাহাড়ের পাঁচালী শোন, ভাল থেকো। ঘোরের মধ্যে জেগে উঠে সেই জীবন্ত কিউবিজম, সেখানে দূরের এক চা বাগান  ডাকে ‘কিন্তু আমার ঠিকানা ? নন্দিনী! নন্দিনী! নন্দিনী!’... 

চোখ খুলতেই ট্রেনটা চোখ থেকে উড়ে বসে রতনের হাতে; জ্যোৎস্নার ফড়িং হয়ে উড়ে যায়। আমি পাখা ধরার চেষ্টা করি; চোখে আটকে রাখতে চাই ঝিঁকঝিঁক ঝিঁকঝিঁক। কিন্তু এই ফড়িং হাওয়া চায়, আলো চায়, ভেঙে ভেঙে রক্তকরবী হতে চায়। কাশফুলে যতই আগুন বাড়ে, আমি ততই সমান্তরাল রেললাইন হয়ে যাই- ‘নন্দিনীর চোখে বেঁচে থাকো ঝিঁকঝিঁক। ভুল আলো তোমার নাগাল পাবে না কোনদিন। তোমার পরিচয় রক্তকরবীর ঘ্রাণে। এই দেখো, নন্দিনীর চোখে কতটা জ্যোৎস্না, কতটা রক্তকরবীর ঘ্রাণ!‘ সে হেসে উঠে দুষ্ট এক ফড়িংয়ের মত; ফড়িংয়ের পিছু নেয়া এক বাচ্চার মত আমিও ছুটে যাই। এবার ছুঁতে পারলেই ঠিকঠাক চোখের জ্যোৎস্নায় তুলে নিব! দূরে ঘন কাশফুলের জ্যোৎস্নায় আগুন তাড়া দেয় ‘মরিবার তরে... মরিবার তরে’...