Wednesday, September 28, 2016

ঠিক এখানেই- গল্পের দু'শ বিয়াল্লিশ কিংবা পঞ্চাশতম শব্দে থমকে পড়ি আমি। কলে পড়া অসহায় ইঁদুরের মতো আটকে যাই শব্দের ফাঁদে আর বাবা নামক সম্পর্কের বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে আমার কেবলই দেখা হতে থাকে। আমার বাবার অবশ্য অল্পতেই ঠাণ্ডা লাগার ধাঁচ ছিল না কিংবা থাকলেও হয়তো সেটা আর ভাবতে পারি না। একটু একটু করে সাইকোটিক ডিপ্রেশনে ডুবে যাওয়া সেঝ আপা বলে আরিটোলা কলোনীর এই ১১ নাম্বার বাসার পুরনো দেয়ালের চুনকামের গভীরে বাবাকে দেখতে পাওয়া যায়। আপা দেখেছে আশ্চর্য রক্ত রাঙা কাপড় হাতে, দুরন্ত ষাঁড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী যোদ্ধা- আমাদের বাবা; দুধ সাদা সব বৃষ্টিতে ভিজে যায় লাল কাপড়, দুরন্ত ষাঁড়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী যোদ্ধা- আমাদের বাবা। সেঝ আপা দেখতে পায় একাত্তরও - প্রচণ্ড ঠাণ্ডা জলে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে তিনটে গ্রেনেড হাতে পাকিস্তানী ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অপরাজেয় মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের বাবা। মা বলে, নভেম্বরের সেই শীতের রাতে বাবা সাড়ে নয় ঘন্টা পানিতে ছিল। মায়ের সাথে আমাদের সম্পর্কটা খাবার ঘরের বারোয়ারি সবুজ গ্লাসটার মতো। যে কেউ যেমন এ গ্লাসে অনায়াসে পানি ঢেলে নেয়, আমরাও তেমন নির্দ্বিধায় মিশে যাই মায়ের সত্যে, মায়ের বলা বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচির সাথে।
বাবাকে 
কখনোই প্রশ্ন করে জানা হয়নি সাড়ে নয় ঘণ্টার সত্যতা । তবে বাবার অল্পতেই ঠাণ্ডা লাগার ধাঁচ ছিল ভাবতে পারি না। মনে পড়ে, ঝড় এলে বাবা আমাদের নিয়ে দরজার পাশে বসে থাকত।  চাল উড়ে যাওয়া ঘরের থেকে বাইরের ঝড়ই নাকি নিরাপদ। ঝড়ের রাতে বাইরে বেরুনো কোন অবস্থাতেই মনঃপুত ছিল না আমার।  তবু ঝড় এলে শাঁখের করাত হয়ে প্রতিবার দরজার কাছেই বসে থাকতাম। ঝড়-বৃষ্টি-ঠাণ্ডার ভয় ছিল না বাবার কোন কালেই।নিখিলেশ, গোয়ানিজ ডিসুদাদের মতো রোদ-ঝড়-বৃষ্টি যাই থাকুক বাবাকে ঠিক পাওয়া যেত আরিটোলা রোডের উত্তমদা'র চায়ের দোকানে। সন্ধ্যের পর যে চায়ের দোকান হয়ে উঠত অন্য কিছুর আসর। কেন যেন বৃষ্টির রাতগুলোর কথাই বেশি মনে পড়ে- সবুজ বারোয়ারি গ্লাসের মতো আমাদের মা এক ঠায়ে বসে থাকত দরজার পাশে জলচৌকি পেতে। মা আমাদের না বললেও আমরা বাবার শরীরে অন্য রকম ঘ্রাণ পেতাম। সেই ঘ্রাণে ভারি হতো আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসা, বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে ঘরময় ভেসে বেড়াতো বাবার দরাজ গলায় গাওয়া গালিবের গজলের সুর। এই গজলের সুর কিংবা এসব বদভ্যেসের জন্য ছোট মামা হয়তো বাবাকে মির্জা গালিব বলে ডাকতো। বড়ো মামা অবশ্য সম্বোধন করত আমড়া কাঠের ঢেঁকি বলে।

বড়ো মামাই একদিন 
শবে বরাতে  চালের রুটি দিয়ে হালুয়া খেতে খেতে আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসার একজন পিতাকে ভালো-মন্দের সত্যেতে মিশিয়ে দিয়েছিল, 'ওর মদ আর জুয়ার নেশার জন্যই চাকরি গেছে। নির্ঘাৎ জুয়া খেলার জন্যই পাখা চুরি করেছে ও।'  হ্যাঁ, তখন আমিও ভেবেছি আর কোন কারণ ছিল না তো। মতিঝিল তখন ছোট্ট এক জলাশয় থেকে একটু একটু করে পরিণত হচ্ছে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। বাড়ছে ঘুপচি, আভিজাতিক আপিস ঘর; বাড়ছে চাহিদা বৈদ্যুতিক পাখার, একটু বিলাসিতার। আপিস পাড়ার সাথে সাথে বাড়িতেও  শুরু হয়েছে হাওয়ার বিলাসিতা কিংবা প্রয়োজনীয়তার। বাবা তখন বৈদ্যুতিক পাখা তৈরির কারখানার জুনিয়ার সুপারভাইজার। হয়তো সেই সুযোগেই চুরি করেছিল একটা মাত্র পাখা। বাবার চুরিকে কাজে লাগিয়ে হয়তো আরও দুটো পাখা চুরি হয়েছিল কারখানা থেকে বাবার অজান্তেই। সেই তিন পাখা চুরির দায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল আমাদের 
বাবা। ক্লাসে একবার ইসমাঈল স্যার 'ফ্রড ট্রাইঅ্যাংগেল' পড়িয়েছিল, 'প্রয়োজনীয়তা, চাপ আর যুক্তিসহকরণ (সবাই করছে, আমি করবো না কেন) আমাদেরকে চোর বানায়।' এই তিন কারণের ভেতর বাবাকে তো দেখতে পাই না। তাই হালুয়া দিয়ে চালের রুটি খেতে থাকা মামার কথাকেই সত্য বলে মনে করেছি অনেক দিন।  হয়তো তাই বাবাকে আমার ঠাণ্ডার গভীরেই ভাবতে ভালো লাগে যেখানে বৈদ্যুতিক পাখা বলে কিছু থাকে না।  

অবশ্য খাবার ঘরের বারোয়ারি সবুজ গ্লাসের মতো আমাদের মা একদিন বলেছিল, বাবা আসলে চুরি করেছিল বড়ো মামার জন্যই। ফাতেমা আপার বিয়েতে শ্বশুর বাড়ি থেকে অনেক কিছুর সাথে বৈদ্যুতিক পাখাও যে যৌতুক চেয়েছিল। ওরা আমাদের বড়ো আপাকে কালো বলে পছন্দ করেনি কিন্তু বদলে পছন্দ করেছিল ফাতেমা আপাকে। অমন সুপাত্র, বড়ো মামাও না করেনি। যদিও পাখা চোরের কালো মেয়ের বিয়ে হয় নি কোনদিন, তবু আরো এক মেয়ের বিয়ের সানাই ধরে রাখতে   
হয়তো একটা বৈদ্যুতিক পাখা চুরির দরকার পড়েছিল আরিটোলা কলোনীর এগারো নাম্বার বাসার এক মির্জা গালিবের।  খুব রাগ হয় বড়ো মামার উপর, ফাতেমা আপার শ্বশুর বাড়ির উপর যে বাড়িতে আমরা অপাঙক্তেয়, ভিখিরি টাইপের শ্যালক/ শ্যালিকা যারা বিনা নোটিশে কাকভেজা হয়ে রাত দশটায় আসতেও দ্বিধা করে না, বাসায় এসে খাবারের বাটিতে ইতস্তত চামচ চালায়, মুখ গুজে শুনে কতটা টানাটানিতে চলছে ব্যবসা। মাঝে মাঝে বাবার চুরি করা পাখাটা ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হয়। হয়তো এতদিনে হারিয়ে গেছে সেই পাখার কল-কব্জা অবধি। তবু মনে হয় এখানেতো কোথাও ছিল। হোক না পরাজিত তবু ছিলতো কোথাও আমার বাবা। হয়তো  তাই সেই বাড়িতে এখনও যাই, ওরাও আমাদের মুখের উপর না বলতে পারে না। হয়তো এও এক ধরনের ঋণশোধ কিংবা বারবার ঋণী হয়ে থাকা, ঋণী করে রাখা।

বাবা বৃষ্টিতেই হারিয়ে যেতে চেয়েছিল আজীবন। আচ্ছা, গল্পের লেখক কী বললেন? মৃত্যর দিনে বৃষ্টি মানে বেহেশত পাওয়ার সুলক্ষণ! বাবাও কী তবে সমস্ত কবীরা গুণাহ ছাপিয়ে বেহেশত পাবে ঈশ্বরের করুণায়? কিন্তু বাবাকে যে মৃত বলেই ভাবতে পারে না আমাদের সবুজ বারোয়ারি  গ্লাসের মতো মা।মা বলে বাবা ফিরবে এক বৃষ্টির রাতে, ঠিক যেমন করে বাবা চলে গিয়েছিল। এসে বলবে, 'নন্দিপাড়ার  জমি বিক্রির টাকা ফেরত নিয়ে আসলাম। ওদের সাথে ব্যবসা নয়,  নিজে একটা পাখার দোকান দেব- লিলুয়া পাখা। বাবা যে বন্ধুর সাথে ব্যবসা করবে বলে ঠিক করেছিল, তার কাছে গিয়েছি অনেক বার। এখনও যাই। মিজানুর চাচা বলে সেই বৃষ্টির রাতে বাবা টাকা ফেরত নিয়েই চলে এসেছিল। কিন্তু বাবা তো আর বাড়ি ফেরে নি। মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ জানি, তবু মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, সেই বৃষ্টির রাতে বাবাকে কী নিখোঁজ করেছে ওরাই

বাবাকে আমরা মরে যেতে দিতে চাই না। তাই বারবার মিজানুর চাচার বাড়ি যাই, বৃষ্টি হলে কাকভেজা হয়েই যাই।  'চাচা বাবার কোন  খোঁজ?'- এখন সে প্রশ্নও করতে হয় না। চুপচাপ বসে থাকি, সামনে বসে থাকেন বাবার বন্ধু।  নাহ্‌ বন্ধু নয়, এক শহুরে সওদাগর। মাথার উপরে ঘুরতে থাকে একটা  সিলিং ফ্যান। মনে হয় বাবা আছে, ভীষণ ভাবে আছে।  হাওয়া কী তবে বাবার মতো হয়?



No comments:

Post a Comment